চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।

চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।
Photo of author
Saheb Roy

Published On:

চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।

ঔপনিবেশিক ভারতের শিক্ষানীতি মূলত শাসনস্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাকে জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক সুবিধা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। এই চিন্তাধারারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় চুইয়ে পড়া নীতি এবং উডের ডেসপ্যাচ–এর মধ্যে। ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এই দুটি ধারণা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে।

চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ?

চুইয়ে পড়া নীতি (Downward Filtration Theory) বলতে বোঝায় এমন একটি শিক্ষানীতি, যেখানে প্রথমে সমাজের উচ্চশ্রেণি ও অভিজাত শ্রেণিকে শিক্ষিত করা হয়, এই বিশ্বাসে যে তাদের মাধ্যমে শিক্ষা ধীরে ধীরে সমাজের নিম্নস্তরে “চুইয়ে পড়বে”। ব্রিটিশ শাসকরা মনে করত, সীমিত সংখ্যক শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি করলেই তারা প্রশাসনে সহায়ক হবে এবং সেই শিক্ষার প্রভাব সাধারণ জনগণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন:  হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।

নীতিটির বাস্তব চরিত্র

এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন শিক্ষা নয়, বরং একটি ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করা। ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। বাস্তবে দেখা যায়, শিক্ষা চুইয়ে পড়ার বদলে সমাজে একটি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে গভীর ব্যবধান সৃষ্টি করে।

উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে উডের ডেসপ্যাচ প্রকাশিত হয়। এটি ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও লিখিত শিক্ষানীতি দলিল। এই ডেসপ্যাচে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো, উদ্দেশ্য ও প্রশাসনিক রূপরেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন

উডের ডেসপ্যাচের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো—এটি ভারতে একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাকে পৃথক স্তরে ভাগ করে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাকাঠামো প্রবর্তন করা হয়। এই স্তরভিত্তিক শিক্ষা ধারণা আজও ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো হিসেবে বিদ্যমান।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ

ডেসপ্যাচে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়, যা ১৮৫৭ সালে বাস্তবায়িত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং ভারতীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার প্রশাসনিক সংস্কার

উডের ডেসপ্যাচ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করার জন্য প্রতিটি প্রদেশে পৃথক শিক্ষা দপ্তর এবং ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (DPI) নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এর ফলে শিক্ষা প্রথমবারের মতো একটি নিয়ন্ত্রিত ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আসে।

আরও পড়ুন:  হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।

ইংরেজি ও মাতৃভাষার নীতি

ডেসপ্যাচ ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করলেও প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ওপর জোর দেয়। এই দ্বৈত ভাষানীতি শিক্ষাকে কার্যকর ও বোধগম্য করার একটি বাস্তব প্রচেষ্টা ছিল, যদিও বাস্তবে ইংরেজি শিক্ষাই বেশি প্রাধান্য পায়।

নারী শিক্ষার স্বীকৃতি

উডের ডেসপ্যাচ প্রথমবারের মতো নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সরকারিভাবে স্বীকার করে। যদিও এটি বাস্তবায়নে ধীরগতি ছিল, তবুও নারী শিক্ষার পথে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনুদান ব্যবস্থা ও বেসরকারি উদ্যোগ

ডেসপ্যাচে বেসরকারি বিদ্যালয়কে অনুদান প্রদানের সুপারিশ করা হয়। এর ফলে মিশনারি ও দেশীয় উদ্যোগে বহু বিদ্যালয় গড়ে ওঠে, যা শিক্ষার বিস্তারে সহায়ক হয়। এই অনুদান ব্যবস্থা পরবর্তী শিক্ষানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও উডের ডেসপ্যাচ সর্বজনীন শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়। চুইয়ে পড়া নীতির প্রভাব এতে সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল। ফলে সাধারণ জনগণের শিক্ষা দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকে যায় এবং শিক্ষা মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

উপসংহার

চুইয়ে পড়া নীতি ও উডের ডেসপ্যাচ—উভয়ই ব্রিটিশ শিক্ষানীতির বাস্তব চেহারা তুলে ধরে। একদিকে এই নীতিগুলি ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে, অন্যদিকে সর্বজনীন শিক্ষার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। তাই উডের ডেসপ্যাচকে একযোগে গঠনমূলক ও সীমাবদ্ধতাসম্পন্ন ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

আরও পড়ুন:  হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।

Leave a Comment