হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।

মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে হান্টার কমিশনের সুপারিশ গুলি আলোচনা করো | হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।
Photo of author
Saheb Roy

Published On:

হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়? হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে লেখো।
আথবা,
মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে হান্টার কমিশনের সুপারিশ গুলি আলোচনা করো

ভূমিকা: উনিশ শতকের ভারতবর্ষে শিক্ষা ছিল কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ব্রিটিশ সরকার শিক্ষার মাধ্যমে একদিকে দক্ষ কর্মচারী তৈরি করতে চাইছিল, অন্যদিকে সমাজে নিজেদের প্রভাব সুদৃঢ় করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা ছিল বিশৃঙ্খল ও অসম। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সমস্যা বিশ্লেষণ ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় হান্টার কমিশন, যা ভারতের মাধ্যমিক শিক্ষানীতিতে এক যুগান্তকারী মোড় নিয়ে আসে।

হান্টার কমিশন কত সালে গঠিত হয়

হান্টার কমিশন গঠিত হয় ১৮৮২ সালে। তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড রিপন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা যাচাই করার জন্য এই কমিশন গঠন করেন। কমিশনের সভাপতি ছিলেন স্যার উইলিয়াম হান্টার। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচের সুপারিশগুলি কতটা কার্যকর হয়েছে তা পর্যালোচনা করা এবং বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন করা। কমিশন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসকদের মতামত সংগ্রহ করে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।

মাধ্যমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে হান্টার কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি

হান্টার কমিশনের মতে মাধ্যমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে বাস্তব জীবনের উপযোগী জ্ঞান প্রদান করা। কমিশন মনে করত যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়মুখী শিক্ষা সমাজের বৃহৎ অংশের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। তাই মাধ্যমিক স্তরে এমন শিক্ষা দরকার যা ছাত্রদের চাকরি, বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। এই ধারণা ভারতীয় শিক্ষানীতিতে একটি বাস্তবমুখী চিন্তার সূচনা করে।

আরও পড়ুন:  চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।

ইংরেজি ও মাতৃভাষার ভারসাম্য

হান্টার কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষায় ইংরেজির গুরুত্ব স্বীকার করলেও মাতৃভাষার ভূমিকা অস্বীকার করেনি। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় ধীরে ধীরে ইংরেজির প্রবর্তন করা উচিত। কারণ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করলে ছাত্ররা বিষয়বস্তু সহজে বুঝতে পারে, আর ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণির জন্য প্রশাসনিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে অপরিহার্য। এই ভারসাম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ভাষানীতিতে বাস্তবতা ও প্রয়োজনের সমন্বয় ঘটায়।

দ্বি-ধারার শিক্ষা (Dual System of Education)

দ্বি-ধারার শিক্ষা বলতে হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষাকে দুটি পৃথক ধারায় বিভক্ত করার নীতিকে বোঝায়। কমিশন স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিল যে সকল শিক্ষার্থীর লক্ষ্য ও সক্ষমতা এক নয়। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে—এই ধারণা অবাস্তব এবং সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর। এই ভুল ধারণা ভাঙতেই হান্টার কমিশন দ্বি-ধারার শিক্ষানীতির প্রস্তাব দেয়।

হান্টার কমিশনের মতে, মাধ্যমিক শিক্ষার একটি ধারা হবে সাধারণ বা একাডেমিক ধারা, আর অন্যটি হবে ব্যবহারিক বা বৃত্তিমূলক ধারা। একাডেমিক ধারার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য ছাত্রদের প্রস্তুত করা। অন্যদিকে বৃত্তিমূলক ধারার উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের বাস্তব জীবনের জন্য দক্ষ করে তোলা, যাতে তারা পড়াশোনা শেষ করেই জীবিকা নির্বাহে সক্ষম হয়।

সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভূমিকা

হান্টার কমিশন স্পষ্টভাবে জানায় যে সরকার একা সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে পারবে না। তাই মাধ্যমিক স্তরে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সরকারকে পরিদর্শন ও অনুদানের মাধ্যমে এই বিদ্যালয়গুলিকে সহায়তা করার কথা বলা হয়। এর ফলে ভারতজুড়ে বহু মিশনারি ও দেশীয় উদ্যোগে মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে, যা শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন:  চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব

কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার। হান্টার কমিশন উপলব্ধি করেছিল যে কেবল সাহিত্যভিত্তিক শিক্ষা ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। শিল্প, কৃষি ও কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য মাধ্যমিক স্তরেই ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার। যদিও বাস্তবে এই সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি, তবুও এটি ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির ভিত্তি স্থাপন করে।

মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক সংস্কার

হান্টার কমিশন শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। প্রদেশভিত্তিক শিক্ষা দপ্তরকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষানীতি প্রয়োগের কথা বলা হয়। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থা কিছুটা বিকেন্দ্রীকৃত হয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ স্থাপিত হয়।

মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারণ ও কাঠামো

হান্টার কমিশন প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক শিক্ষার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কমিশনের মতে, প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মাঝখানে মাধ্যমিক স্তরকে একটি স্বতন্ত্র ধাপ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই স্তরেই ছাত্রদের মানসিক পরিপক্বতা, শৃঙ্খলা ও বৌদ্ধিক সক্ষমতা বিকশিত হয়। তাই মাধ্যমিক শিক্ষাকে অপরিকল্পিত বা অবহেলিত রাখা যাবে না—এমন স্পষ্ট অবস্থান কমিশন গ্রহণ করে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা বৃদ্ধি

মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য দক্ষ শিক্ষক অপরিহার্য—এই বিষয়টি হান্টার কমিশন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। কমিশন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দেয় এবং শিক্ষকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখে। কারণ অদক্ষ শিক্ষক থাকলে উন্নত পাঠ্যক্রমও কার্যকর হয় না। এই সুপারিশ ভবিষ্যতে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে।

আরও পড়ুন:  চুইয়ে পড়া নীতি বলতে কী বোঝ? উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব ও তাৎপর্য লেখো।

অনুদান নীতি (Grant-in-Aid System)

হান্টার কমিশনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল অনুদান নীতি প্রবর্তনের সুপারিশ। এর মাধ্যমে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে সরকারি সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এই অনুদান শর্তসাপেক্ষ ছিল—বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, নিয়মিত পরিদর্শন ও নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম মানতে হতো। এর ফলে একদিকে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ে, অন্যদিকে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে থাকে।

নারী শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

যদিও হান্টার কমিশন সরাসরি নারীদের জন্য আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেনি, তবুও কমিশন নারী শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়। এটি ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল এবং পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারে সহায়ক হয়।

শহর ও গ্রামভিত্তিক বৈষম্য দূর

কমিশন লক্ষ্য করে যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি প্রধানত শহরকেন্দ্রিক ছিল। গ্রামাঞ্চলের ছাত্ররা এই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তাই গ্রামীণ এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে কেবল শহুরে অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল।

উপসংহার: হান্টার কমিশন (১৮৮২) ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষানীতিতে এর সুপারিশগুলি শিক্ষাকে বাস্তবমুখী, বহুমুখী ও সমাজোপযোগী করে তুলতে চেয়েছিল। যদিও সব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এই কমিশন ভারতীয় শিক্ষানীতিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয় এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের পথ প্রশস্ত করে। বলা যায়, হান্টার কমিশনের মাধ্যমেই ভারতের মাধ্যমিক শিক্ষা আধুনিক রূপ নেওয়ার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:
এই উত্তরে অতিরিক্ত পয়েন্ট আলোচনা করা হয়েছে, তাই ৫ নম্বর বা ১০ নম্বরের প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন ও প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত পয়েন্ট নির্বাচন করে ব্যবহার করতে পারবে। সব পয়েন্ট একসঙ্গে লেখার বাধ্যবাধকতা নেই।

Leave a Comment